সারা দেশে ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ দোষীদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি

সারা দেশে ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ দোষীদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি

ধর্ষকদের গ্রেফতার ও তাদের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে গতকালও সারা দেশে বিক্ষোভ, সমাবেশ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মূলত শিক্ষার্থীরা এসব কর্মসূচির ডাক দিলেও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের সাথে যোগ দেন এবং তাদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন। এ দিকে রাজধানীসহ কয়েকটি স্থানে এসব কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দিয়েছে। তবে কয়েকজন আহত হয়েছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে পৈশাচিক নির্যাতনের প্রতিবাদে গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। শাহবাগ থেকে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অভিমুখে যাত্রা করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে জড়ো হয়ে ‘ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে ফের বিক্ষোভ শুরু করে ছাত্র ইউনিয়ন। এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরাও তাদের সাথে অংশ নেন। শাহবাগ থেকে কালো পতাকা মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা ঘুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে যাত্রা করলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। এ সময় পুলিশের সাথে মিছিলকারীদের হাতাহাতি হয়। পরে পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করলে ছাত্র ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন। সেখান থেকে তারা আবারো শাহবাগের দিকে চলে যায়।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কাকরাইল মোড়ে শিক্ষার্থীরা জড়ো হন এবং তারা সেখানে বিক্ষোভ করেন। কাকরাইল মোড়ে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেয়ায় এ সময় আশপাশের রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই ঘণ্টা শিক্ষার্থীরা ওই স্থানে অবস্থান করেন এবং নারী নির্যাতনবিরোধী বক্তব্য দেন।

রাজধানীর উত্তরা ও ধানমন্ডিতেও গতকাল বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীদের সাথে সাধারণ মানুষও অংশ নেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জসিম উদ্দিন হল ছাত্র সংসদের জিএস ইমাম হাসানের নেতৃত্বে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থী। তাদের সাথে আরো অনেকে অংশ নেন।
গাজীপুর মানববন্ধন

গাজীপুর সংবাদদাতা জানান, সিলেট-নোয়াখালীসহ দেশব্যাপী বেপরোয়া গণধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছে ইসলামী ছাত্র খেলাফত গাজীপুর মহানগরী শাখা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মহানগরের বাইপাস মোড় এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার এ মনববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানববন্ধনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব, খেলাফতে ইসলামী বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা ফজলুর রহমান। পরে মহানগর ইসলামী ছাত্র খেলাফতের সভাপতি মাওলানা শফিকুল ইসলাম মারুফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে অন্নান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা ইসলামী ঐক্যজোটের সেক্রেটারি মাওলানা মুখলেছুর রহমান, মুফতি মুহসীনুদ্দীন কাসেমী, মুফতি ইবরাহিম, মুফতি ফারুক হুসাইন, মহানগর ছাত্র খেলাফতের জয়েন্ট সেক্রেটারি হাফেজ আমিনুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক মিনহাজ উদ্দীনসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

রাজশাহীতে মানববন্ধন-বিক্ষোভ: রাজশাহী ব্যুরো জানায়, ধর্ষকদের গ্রেফতার ও মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে রাজশাহীতে প্রতিবাদী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার নগরীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ও গ্রিন ভয়েস রাজশাহী শাখার ব্যানারে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ সংহতি জনিয়ে বক্তব্য দেন।

মানববন্ধনে বক্তারা ৬ দফা দাবি জানান। এসব দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। ৬ দফা দাবি হলোÑ ধর্ষণের বিচারের জন্য দ্রুত আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। সুষ্ঠু তদন্তের ভিত্তিতে যেকোনো ধর্ষণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড ও গণধর্ষণের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। ১৮ বছরের নিচে কোনো কিশোর বা কিশোরী ধর্ষিত হলে তার পড়াশোনা, চিকিৎসাসহ সব দায়ভার রাষ্ট্রের নিতে হবে। ধর্ষণ মামলা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে এবং রায় দ্রুত কার্যকর করতে হবে। ধর্ষণকে জামিন অযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করতে হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে সংঘটিত সব ধর্ষণ মামলার বিচারের কাজ নিষ্পত্তি করতে হবে। কোনো ধর্ষণ মামলায় প্রশাসনের কারো স্বজনপ্রীতি, গাফিলতি ধরা পড়লে অথবা টাকা নিয়ে নিষ্পত্তি করতে চাইলে কিংবা তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

টাঙ্গাইলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ: টাঙ্গাইল সংবাদদাতা জানান, দেশজুড়ে নারী ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে টাঙ্গাইলে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সকালে শহীদ মিনার থেকে একটি মিছিল বের করে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এ ছাড়া ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে স্থানীয় শহীদ মিনারের সামনে ছাত্র ও যুব অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা চোখে কালো ব্যাজ পড়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে।

এ সময় শিক্ষার্থীদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল মা তুমি বিবস্ত্র মানেই পুরো বাংলাদেশ বিবস্ত্র, যেই রাষ্ট্র ধর্ষকের সেই রাষ্ট্র আমার না, পাহাড় থেকে সমতল সব নারীর নিরাপত্তা চাই, মায়ের জাতি বাঁচতে চায়, ধর্ষণ মুক্ত বাংলাদেশ চাই, বাংলাদেশে আর কত ধর্ষণ হলে তুমি জাগবে, বাংলাদেশে করোনার ভ্যাকসিনের চেয়ে ধর্ষণের ভ্যাকসিন বেশি দরকার, ধর্ষণের শাস্তি একটাই মৃত্যুদণ্ড।

কুমিল্লায় যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ: কুমিল্লা সংবাদদাতা জানান, দেশব্যাপী যৌন হয়রানি, নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিক্ষোভ হয়েছে কুমিল্লায়। নগরীর পূবালী চত্বরে আয়োজিত ওই বিক্ষোভ থেকে আইন সংশোধন করে ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন পরিবর্তন করে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার দাবি জানান আন্দোলনকারীরা।
বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভে অংশ নেন। বক্তারা বলেন, নোয়াখালীতে গৃহবধূকে শ্লীলতাহানির ন্যক্কারজনক ঘটনা এবং সিলেট, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে নারীদের ওপর সহিংসতায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। দ্রুত বিচার কার্যকর করা হচ্ছে না বলে যৌন হয়রানির মতো অপরাধগুলো এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *