প্রতিবাদমুখর নোয়াখালী

প্রতিবাদমুখর নোয়াখালী

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় স্বামীকে বেঁধে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় গৃহবধূকে নিজ ঘরে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার পুরো নোয়াখালী ছিল প্রতিবাদমুখর।

এ দিকে গতকাল এই ঘটনায় জড়িত প্রধান আসামি বাদল ও ইউপি সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। পৃথক দু’টি মামলায় প্রধান আসামি বাদলের ২০ দিন এবং ইউপি সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। নোয়াখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ৩ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মাশফিকুল হক প্রধান আসামি বাদলের সাত দিন এবং সোহাগের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বেগমগঞ্জ মডেল থানার এসআই মোশতাক আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেন। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গতকাল আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। এ নিয়ে এ ঘটনায় চারজনকে রিমান্ডে নেয়া হলো। এ ঘটনার প্রতিবাদে পুরো নোয়াখালী ফুঁসে উঠেছে। মঙ্গলবারও জেলার বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সোমবার রাতে মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তিনি একলাশপুরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য। অপর দিকে মামলার ৫ নম্বর আসামি সাজুকে (২১) ঢাকা থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুনুর রশিদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ভিকটিম নোয়াখালী জেলা পুলিশ সুপারের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন ইউপি সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগের কাছে তিনি বিচারপ্রার্থী হয়েছেন কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি এবং কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি। এ নিয়ে এ ঘটনায় গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়াল ৬ জনে। তার মধ্যে ৪ জন এজাহারভুক্ত আসামি। সোমবার সন্ধ্যায় গ্রেফতারকৃত আবদুর রহিম ও রহমত উল্যাকে আদালতে পাঠিয়ে পৃথক দু’টি মামলায় ৭ দিন করে ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আদালত তিন দিন করে একেক জনের ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এ দিকে মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন। তিনি ভিকটিম এবং তার পরিবারের সাথে কথা বলেন। পরে সাংবাদিকদের জানান, এ ঘটনার সাথে জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। দ্রুততম সময়ে সব আসামিকে গ্রেফতার করা হবে। মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (তদন্ত ও অভিযোগ) আল মাহমুদ ফজলুল কবিরও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভিকটিমের সাথে কথা বলেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, দেলোয়ার ইতঃপূর্বে আরো কয়েকবার ভয়ভীতি দেখিয়ে ভিকটিমকে ধর্ষণ করে এবং এ ঘটনা যদি কারো কাছে প্রকাশ করে তাহলে তাদের কাছে থাকা আরো ভিডিওগুলো ইন্টারনেটে প্রকাশ করে দিবে বলে হুমকি দেয়। নিরাপত্তাহীনতার ও ভয়ের কারণে ঘটনার মূল হোতা দেলোয়ারের নাম প্রকাশ করেননি ভিকটিম। আমরা এ ঘটনায় একটি ধর্ষণ মামলা করব।

এ দিকে দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারের মাছের খামার থেকে সাতটি ককটেল ও দু’টি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, সোমবার সন্ধ্যায় বেগমগঞ্জের দেলোয়ারের মাছের খামারে র্যাব-১১ এর একটি টিম অভিযান চালায়। এ সময় ওই মাছের খামার থেকে সাতটি তাজা ককটেল ও দু’টি গুলি উদ্ধার করা হয়।

তার আগে রোববার রাত ১টায় ৯ জনকে বিবাদি করে বেগমগঞ্জ মডেল থানায় পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করেন নির্যাতিতা। একটি নারী ও শিশু নির্যাতন অপরটি পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে। পুলিশ রোববার রাত ১১টায় এলাকার মোহর আলী মুন্সি বাড়ির মৃত আ: রহিমের ছেলে মামলার ৯ নম্বর আসামি রহমত উল্লাকে (৪০) গ্রেফতার করে। এর আগে বিকেলে একলাশপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খালপাড় এলাকার হারাধন ভুঁইয়া বাড়ির শেখ আহমদ দুলালের ছেলে মামলার ২ নম্বর আসামি আ: রহিমকে (২০) গ্রেফতার করে পুলিশ। রাতে প্রধান আসামি বাদলকে ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এবং দেলোয়ারকে অস্ত্রসহ নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে র্যাব। সোমবার রাত ৮টায় বাদলকে বেগমগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়। এ দিকে ঘটনার প্রধান হোতা যুবলীগ নেতা দেলোয়ারকে মামলার এজাহার থেকে বাদ দেয়ায় সর্বত্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

বাদি তার এজাহারে উল্লেখ করেন, ঘটনার রাতে অভিযুক্তরা দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ তার স্বামীকে মারধর করে বেঁধে ফেলে। তাকে পাশের রুমে নিয়ে টর্চলাইট জ্বালিয়ে তার পরনের কাপড় খুলে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। বাদিকে উলঙ্গ করে মোবাইলে ভিডিওচিত্র ধারণ করে এবং শরীরের লজ্জাস্থানে হাত দেয়। পরবর্তীতে অভিযুক্তরা মোবাইলফোনে কুপ্রস্তাব দেয়। এতে রাজি না হওয়ায় ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়।

এ দিকে ভিকটিম জানান, আমাকে মোবাইলফোনে কুপ্রস্তাব দেয়া হয় ও পরবর্তীতে দেলোয়ার আমাকে ইয়াবা ব্যবসা করতে বলে। এতে ব্যর্থ হয়ে আমার ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং ভিডিও ফেসবুকে ছেড়ে দেয়া হয়। আমার চিৎকার আশপাশের সবাই শুনলেও কেউ ভয়ে এগিয়ে আসেনি। তারা আমাকে হুমকি দিয়ে ভিটেবাড়ি ছাড়া করে।

বিএনপির মানববন্ধন : নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের প্রতিবাদে জেলার প্রধান বাণিজ্য শহর চৌমুহনী ডিবি রোডে উপজেলা ও চৌমুহনী পৌর বিএনপির উদ্যোগে মঙ্গলুবার সকালে এক বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্যা বুলু। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্য শামীমা বরকত লাকী, উপজেলা বিএনপির নবনির্বাচিত সভাপতি কামাক্ষা চন্দ্র দাস, সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হক আবেদ, সহসভাপতি ওমর শরীফ তানিয়ার পৌর বিএনপির সভাপতি জহির উদ্দিন হারুন, সাধারণ সম্পাদক মো: মহসিন। যুবদলের জেলা সভাপতি মঞ্জুরুল আজিম সুমন, পৌর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মোরশেদুল আমিন ফয়সল, বিএনপি নেতা নিজাম উদ্দিন, ইসমাইল হোসেন, দুলাল প্রমুখ। এ দিকে নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন। এতে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম হায়দর বিএসসি, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা আবু নাছের, সলিম উল্যা বাহার হিরণ, ছাত্রদলের জেলা সভাপতি আজগর উদ্দিন দুখু, সাধারণ সম্পাদক আবু হাসান নোমান প্রমুখ।

জামায়াতের বিক্ষোভ : নোয়াখালীতে গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে বর্বর নির্যাতন ঘটনার প্রতিবাদে ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উপজেলা জামায়াতের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় একলাশপুর বাজারে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আলা উদ্দিন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন ফারুক, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা বোরহান উদ্দিন, জেলা নায়েবে আমির এছাক খন্দকার, বেগমগঞ্জ উপজেলা আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন, ছাত্রশিবির জেলা সভাপতি মো: গোলাম কিবরিয়া, একলাশপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির গিয়াস উদ্দিন মেম্বার প্রমুখ। বক্তারা গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

বিভিন্ন সংগঠনের মানববন্ধন : মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে জেলা যৌন হয়রানি নির্মূলকরণ নেটওয়ার্ক। এতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।

একই সময় জেলা জজ আদালত সড়কে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ফোরাম।এ সময় বক্তারা বলেন, একের পর এক নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও এসব ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অপরাধীরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় নিজেকে আড়াল করছে। বক্তারা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্মম নির্যাতনের সাথে জড়িতদের ইন্ধনদাতাদেরকে দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

দেলোয়ার না’গঞ্জে ২ দিনের রিমান্ডে  নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় আলোচিত দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান মো: দেলোয়ার হোসেনকে অস্ত্র মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে দেলোয়ারকে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক ফাহমিদা বেগম দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত রোববার দিবাগত রাতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন শিমরাইল এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে দেলোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। এ সময় তার দেহ তল্লাশি করে একটি পিস্তল, একটি ম্যাগজিন ও দুটি গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় র্যাব-১১-এর ডিএডি আব্দুল্লাহ শেখ বাদি হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।

দেলোয়ারের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গত সোমবার সন্ধ্যায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে দেলোয়ারের মাছের খামারে র্যাব ১১-এর একটি টিম অভিযান চালায়। এ সময় ওই মাছের খামার থেকে সাতটি তাজা ককটেল ও দুটি গুলি উদ্ধার করা হয়।
গত ২ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নে এক গৃহবধূর বসতঘরে ঢুকে তার স্বামীকে পাশের কক্ষে বেঁধে রাখে দেলোয়ার বাহিনীর বাদলসহ অন্যরা। এরপর তারা গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এ সময় গৃহবধূ বাধা দিলে তারা বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর করে মোবাইলে ভিডিওচিত্র ধারণ করে। পরে অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

এ ঘটনায় নির্যাতনের শিকার ওই নারী বাদি হয়ে গত রোববার রাতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে বেগমগঞ্জ থানায় মামলা করেছেন। সেখানে ৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো সাত-আটজনকে আসামি করা হয়। তবে সেখানে নাম উল্লেখ করে দেলোয়ারকে আসামি করা হয়নি। এরই মধ্যে দুটি মামলার এজাহারভুক্ত চার আসামিসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই আসামিকে ছয় দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *